প্রাথমিক শিক্ষা একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রথম ও প্রধান ভিত্তি। শিশুর ভাষা, চিন্তা, মূল্যবোধ, আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক আচরণের বিকাশ শুরু হয় প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই। তাই প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন শুধু সরকারের একক দায়িত্ব নয়, এটি সমাজ, অভিভাবক, শিক্ষক এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত দায়িত্ব। এই ক্ষেত্রে একটি বিদ্যালয়ের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন বা প্রাক্তন শিক্ষার্থী সংগঠন অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
একটি বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাই সেই প্রতিষ্ঠানের জীবন্ত সম্পদ। তারা জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়ে সমাজে অবদান রাখেন। কেউ শিক্ষক, কেউ চিকিৎসক, কেউ প্রকৌশলী, কেউ সরকারি কর্মকর্তা, কেউ ব্যবসায়ী, কেউবা সমাজকর্মী। তাদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, সামাজিক যোগাযোগ ও সামর্থ্য যদি নিজ বিদ্যালয়ের উন্নয়নে যুক্ত হয়, তবে একটি সাধারণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ও ধীরে ধীরে আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে।
প্রথমত, অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন বিদ্যালয়ের শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখনো পর্যাপ্ত বেঞ্চ-ডেস্ক, পাঠাগার, খেলাধুলার সামগ্রী, নিরাপদ পানীয় জল, স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট, বিদ্যুৎ, ফ্যান বা ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণের অভাব রয়েছে। প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা সম্মিলিতভাবে তহবিল গঠন করে এসব ঘাটতি পূরণে সহায়তা করতে পারেন। একটি ছোট পাঠাগার, একটি শিশু কর্নার, দেয়ালে শিক্ষামূলক চিত্র, পরিচ্ছন্ন স্কুল প্রাঙ্গণ কিংবা গাছপালা দিয়ে সাজানো পরিবেশ এসব উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়ায়।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা দেওয়ার ক্ষেত্রে অ্যালামনাইদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশু যখন দেখে, তারই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র বা ছাত্রী আজ সমাজে সম্মানের জায়গায় পৌঁছেছেন, তখন তার মনেও বড় হওয়ার স্বপ্ন জন্ম নেয়। অ্যালামনাই সদস্যরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে এসে শিশুদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন, নিজের জীবনের সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প শোনাতে পারেন। এতে শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং তারা বুঝতে শেখে সুযোগ পেলে গ্রামের বা পাড়ার একটি সাধারণ স্কুল থেকেও বড় স্বপ্ন দেখা যায়।
তৃতীয়ত, দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হতে পারে। অনেক শিশু শুধু খাতা-কলম, স্কুলব্যাগ, পোশাক বা প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের অভাবে পিছিয়ে পড়ে। অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন শিক্ষা সহায়তা তহবিল’ গঠন করে এসব শিশুকে সহযোগিতা করতে পারে। তবে এই সহায়তা যেন শিশুর আত্মসম্মান নষ্ট না করে, বরং তাকে উৎসাহিত করে সে বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখতে হবে।
চতুর্থত, শিক্ষকদের সম্মান ও উৎসাহ বৃদ্ধিতেও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা ভূমিকা রাখতে পারেন। একটি বিদ্যালয়ের মান অনেকাংশে নির্ভর করে শিক্ষকের আন্তরিকতা, দক্ষতা ও প্রেরণার ওপর। অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন বছরে একবার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক সম্মাননা, শিক্ষক দিবস উদযাপন, প্রশিক্ষণ কর্মশালা বা অভিজ্ঞতা বিনিময় সভার আয়োজন করতে পারে। এতে শিক্ষকরা নিজেদের কাজের সামাজিক স্বীকৃতি অনুভব করেন এবং আরও আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালনে উৎসাহিত হন।
পঞ্চমত, বিদ্যালয়ের সঙ্গে অভিভাবক ও সমাজের সম্পর্ক শক্তিশালী করতেও অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন সহায়ক হতে পারে। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর নিয়মিত উপস্থিতি, ঝরে পড়া রোধ, অভিভাবক সভা, স্বাস্থ্যবিধি, শিশু নিরাপত্তা, সহশিক্ষা কার্যক্রম এসব বিষয়ে তারা শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে পারে। তবে তাদের ভূমিকা হতে হবে সহযোগিতামূলক, নিয়ন্ত্রণমূলক নয়। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে সম্মান করে, স্থানীয় বাস্তবতা বুঝে এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করলেই এই উদ্যোগ ফলপ্রসূ হবে।
ষষ্ঠত, আধুনিক শিক্ষা উপকরণ ও প্রযুক্তির ব্যবহারে অ্যালামনাইরা বড় অবদান রাখতে পারেন। বর্তমান সময়ে শিশুদের আনন্দময় ও কার্যকর শিক্ষার জন্য শুধু পাঠ্যবই যথেষ্ট নয়। ছবি, গল্প, চার্ট, বিজ্ঞান কিট, গণিত উপকরণ, অডিও-ভিডিও কনটেন্ট, ডিজিটাল ক্লাসরুম এসব শিক্ষাকে সহজ ও আকর্ষণীয় করে তোলে। প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা প্রযুক্তি, শিক্ষা, প্রকাশনা বা উন্নয়ন খাতে কাজ করেন, তারা বিদ্যালয়ের জন্য উপযোগী উপকরণ তৈরি, সংগ্রহ বা ব্যবহারের প্রশিক্ষণে সহায়তা করতে পারেন।
সপ্তমত, বিদ্যালয়ের ইতিবাচক কর্মকাণ্ড প্রচার ও যোগাযোগ বৃদ্ধির জন্য প্রতিটি বিদ্যালয়ের নামে একটি ফেসবুক পেজ খোলা যেতে পারে। পেজটি প্রধান শিক্ষক অথবা আইসিটিতে দক্ষ কোনো শিক্ষক দায়িত্ব নিয়ে পরিচালনা করতে পারেন। এর মাধ্যমে বিদ্যালয়ের জাতীয় দিবস উদযাপন, শিক্ষার্থীদের বিশেষ অর্জন, সহশিক্ষা কার্যক্রম, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পাঠাগার কার্যক্রম এবং বিভিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগ নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা যেতে পারে। এতে বিদ্যালয়ের কাজ দৃশ্যমান হবে, অভিভাবক ও স্থানীয় সমাজের আগ্রহ বাড়বে এবং দূরে থাকা প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাও বিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুযোগ পাবেন। অনেক সময় একটি ভালো কাজ প্রচারের অভাবে অজানা থেকে যায়; ফেসবুক পেজ সেই ভালো কাজকে সমাজের সামনে তুলে ধরতে পারে।
তবে অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের কার্যক্রম যেন কেবল পুনর্মিলনী, ব্যানার, ছবি তোলা বা স্মৃতিচারণে সীমাবদ্ধ না থাকে। একটি সফল অ্যালামনাই সংগঠনের থাকতে হবে সুস্পষ্ট লক্ষ্য, বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা, স্বচ্ছ হিসাবব্যবস্থা এবং বিদ্যালয়ের বাস্তব প্রয়োজনভিত্তিক উদ্যোগ। প্রতি বছর বিদ্যালয়ের সমস্যা চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা যেতে পারে। যেমন প্রথম বছরে পাঠাগার, দ্বিতীয় বছরে দরিদ্র শিক্ষার্থী সহায়তা, তৃতীয় বছরে শিক্ষক সম্মাননা, চতুর্থ বছরে ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণ এবং নিয়মিতভাবে বিদ্যালয়ের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবস্থাপনা। এতে কাজ ধারাবাহিক, দৃশ্যমান ও টেকসই হবে।
প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করছে। কিন্তু একটি বিদ্যালয় তখনই প্রকৃত অর্থে প্রাণবন্ত হয়, যখন তার সঙ্গে স্থানীয় সমাজের আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়। অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন সেই সম্পর্কের সেতুবন্ধন। তারা অতীতের স্মৃতি, বর্তমানের দায়িত্ব এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নকে একত্র করতে পারে।
অতএব, প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সক্রিয়, দায়িত্বশীল ও স্বচ্ছ অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন গড়ে তোলা সময়ের দাবি। যে বিদ্যালয় একদিন প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মানুষ করেছে, সেই বিদ্যালয়ের বর্তমান শিশুদের মানুষ করার দায়িত্বে তারা এগিয়ে এলে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে একটি শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠতে পারে। এই উদ্যোগের সুফল পাবে শুধু একটি বিদ্যালয় নয়, পুরো সমাজ এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ।
লেখক:
মোঃ আব্দুল কাইয়ুম খান
উপজেলা নির্বাহী অফিসার, নড়িয়া, শরীয়তপুর।