Sunday, 8th November, 2026

জাজিরার মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে পাইনপাড়ার চর

পদ্মার ভাঙনে জাজিরার মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে উপজেলার পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের মূলভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন পদ্মা বেষ্টিত পাইনপাড়া চর। কয়েক দিনের ভাঙনে ও ভাঙ্গন আতংকে জনপদের দুই শতাধিক পরিবার সহায় সম্বল নিয়ে অন্যত্র চলে গেছে। তারা পদ্মা সেতুর জিরো পয়েন্ট থেকে ৪০০ মিটার দূরে খোলা মাঠে আশ্রয় নিয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা। তাদের কেউ কেউ ঘর তুলতে পারলেও অনেকেই এখনো খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ভাঙাচুরা চালের মধ্যেই বসবাস করছেন। উপজেলা প্রশাসন জরুরী ত্রাণ সহায়তা দিলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ ভাঙন কবলিতদের। ভাঙন ঝুঁকিতে আছে ৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ ও মক্তবসহ দুই শতাধিক বসতবাড়িসহ ৬শ’ হেক্টর আবাদি জমি। শীত মৌসুমে এ চরের পাশের পদ্মা থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে ভাঙন তীব্র হয়েছে বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে পদ্মার পানি কমতে থাকায় গত ১০-১২ দিন ধরে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, দ্রুত ভাঙন রোধের জরুরী পদক্ষেপসহ স্থায়ী ভাঙন রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমরা দাবি জানিয়ে আসছি।
পাইনপাড়া আলমখার কান্দি গ্রামের জব্বার মোড়ল (৭৫) বলেন, পাইনপাড়া চরের চার দিক থেকে রাতের আঁধারে ড্রেজার দিয়ে অবৈধ ভাবে বালু উত্তোলনের ফলে গত দুই বছর থেকেই আমাদের এই চরে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এবার গত মাসের প্রথম থেকেই ভাঙন শুরু হলেও গত ১০-১২ দিন যাবত ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে।
একই গ্রামের রোস্তম ফরাজি বলেন, এতদিন আমরা নিজের ভিটেমাটিতে ঝুঁকি নিয়েই বসবাস করে আসছিলাম। কিন্তু ভাঙ্গন অব্যাহত থাকায় আজ কালের মধ্যে যদি বাড়ি-ঘর না সরিয়ে নেই তাহলে পদ্মায় পুরোটাই হারিয়ে যাবে। আমাদের অনেকেই ইতিমধ্যে পদ্মা সেতুর পূর্ব দিকে মাঝিরঘাটের পশ্চিমে খোলা জমিতে অস্থায়ী ভাবে থাকছে। আমরাও সেখানে গিয়ে উঠব ভাঙনের কবলে পড়ে আমরা অনেক পরিবারই এখন ভূমিহীন। নদীগর্ভে বিলীন হওয়া আমাদের পরিবারগুলোর জন্য যদি সরকার একটা জায়গার ব্যবস্থা করে দিত তাহলে আমরা অন্তত মাথা গোজার ঠাই পেতাম।
এ চরে বসবাসকারী হোসেন মাদবর (৬৭) বলেন, ২০-২৫ বছর আগে এই চরটি জেগে ওঠার পর থেকেই আমরা এখানে বসবাস করে আসছি। বর্ষায় পদ্মার ভাঙনের সাথে আমরা পরিচিত হলেও এই চরে বসবাস করতে এসে এখন অসহায় হয়ে পরেছি। এই চরের চতুর্দিকেই পদ্মা নদী। বর্ষাকাল আসলেই ভাঙন আতংকে আমাদের দিন কাটে। আত্মীয়-স্বজন অনেকেই সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে। তাই সরকার যদি নড়িয়া, জাজিরা, ভেদরগঞ্জ ও সখিপুরের মতো করে দ্রুত স্থায়ী রক্ষা বাধের ব্যবস্থা করে তবেই এই চরটি রক্ষা পাবে। তা না হলে পদ্মা নিয়ে যাবে।
পূর্বনাওডোবা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো: আলতাফ হোসেন খান বলেন, ৮৫০ হেক্টর ভূমি জুড়ে পাইনপাড়া চরটি জেগে ওঠে। এরপর থেকেই এখানে বসতি গড়তে থাকে আসপাশের মানুষ। এখন এ চরে সাড়ে পাঁচশতাধিক পরিবারের বসতি রয়েছে। চরের আলমখার কান্দি ও আহমদ মাঝি কান্দি নামে দুইটি গ্রাম। গত দুই বছরের ভাঙনে এখান থেকে দুই শতাধিক পরিবার গৃহহীন হয়ে চলে গেছেন। বর্তমানে ভাঙনের ঝুকিতে আছে ৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৪টি মাদ্রাসা ও কয়েকটি মসজিদসহ আড়াই শতাধিক পরিবার। যদি স্থায়ী ভাঙন রোধে কোন ব্যব¯’া না নেয়া হয়, তাহলে দ্রুতই এ চরটি জাজিরা উপজেলার মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে। তাই এই চরটি রক্ষায় সরকারের কাছে জরুরী ভিত্তিতে ¯’ায়ী ভাঙন রোধের ব্যব¯’া গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি ।
শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী দেওয়ান রকিবুল হাসান বলেন, প্রতি বর্ষায়ই আমরা ভাঙন রোধে জরুরী ব্যবস্থা হিসেবে জিও ব্যাগ ডাম্পিং করে থাকি। পদ্মার মাঝ খানে অবস্থিত পাইনপাড়া চরে বিগত দুই বছরে আমরা ৩০ হাজারেরও বেশি জিও ব্যাগ ডাম্পিং করেছি। ভাঙন কবলিতদের দাবি অনুযায়ী চরটি রক্ষায় দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যব¯’া গ্রহণের জন্য উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাবনা পেশ করব। কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তীতে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
জাজিরা উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাদিয়া ইসলাম বলেন, পাইনপাড়া চরের ভাঙন কবলিত ক্ষতিগ্রস্ত দুইশ পরিবারকে আমরা ইতিমধ্যে জরুরী সহায়তা প্রদান করেছি। পুনর্বাসন কার্যক্রমের জন্য তালিকা প্র¯‘ত করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তাছাড়া পদ্মা নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে আমরা কঠোর অভিযান পরিচালনাসহ সতর্ক নজরদারি করছি। আর যাতে নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন করতে না পারে।