Thursday, 20th August, 2026

হরমুজ প্রণালির চাবিকাঠি ৭ দ্বীপ দখলের পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের

মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার মার্কিন স্থলসেনা পাঠানোর খবরের পর ধারণা করা হচ্ছে তাদের প্রধান লক্ষ্য হতে পারে ইরানের খারগ দ্বীপ দখল করা। উত্তর পারস্য উপসাগরে অবস্থিত এই দ্বীপটি তেহরানের তেলের ৯০% রপ্তানির মূল কেন্দ্র। তবে খারগ শুধুমাত্র একটি দ্বীপ নয়, উপসাগরে আরো কয়েকটি দ্বীপ রয়েছে যেগুলো জাহাজ এবং নৌযানের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার জন্য আরো গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণে।

সান ইয়াত-সেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এই সাতটি দ্বীপ- আবু মুসা, গ্রেটার তুনব, লেসার তুনব, হেংগাম, কেশম, লারাক এবং হরমুজকে ইরানের “আর্ক ডিফেন্স” বা আয়াতাকার প্রতিরক্ষা বলছেন।

গবেষক এনায়াতোল্লাহ ইয়াজদানি ও চীনের মা ইয়ানঝে ২০২২ সালে কানাডিয়ান সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এডুকেশনের জন্য লেখা এক গবেষণাপত্রে লিখেছিলেন, এই দ্বীপগুলো সংযুক্ত একটি কাল্পনিক রেখা ইরানের কৌশলগত প্রধান হাতিয়ার হিসেবে সাহায্য করে এবং হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের লেখা অনুযায়ী, আর্কের পশ্চিম প্রান্তে ছোট তিনটি দ্বীপ—আবু মুসা, গ্রেটার তুনব ও লেসার তুনব এই প্রণালী নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
এই দ্বীপগুলোর মধ্যে সীমিত দূরত্ব এবং পানির গভীরতা বেশি থাকার কারণে বড় যুদ্ধজাহাজ এবং ট্যাংকারগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে এই তিনটি দ্বীপের পাশে দিয়ে যেতে হয়। ফলে এই পথের মাধ্যমেই যুদ্ধজাহাজ থেকে মাইন লেয়ার বা ড্রোন ব্যবহার করে সহজেই ইরানের ইসলামিক রেভলিউশন গার্ডস কর্পসকে (আইআরজিসি) হামলার লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।

ইরানি কর্মকর্তারাও এই দ্বীপগুলো “স্থায়ী ও অডুবনীয় বিমানবাহী বাহক” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। গত বছর আইআরজিসি ঘোষণা করেছিল তারা আবু মুসা, গ্রেটার তুনব এবং লেসার তুনবে তাদের উপস্থিতি জোরদার করছে। সেই সময় আইআরজিসি নৌবাহিনী কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল আলিরেজা টানগসিরি বলেছিলেন, আমাদের কৌশলগত নির্দেশনা অনুসারে, এই দ্বীপগুলোকে সশস্ত্র করা এবং কার্যকর করা অপরিহার্য। আমরা প্রতিপক্ষের ঘাঁটি, যুদ্ধজাহাজ ও অন্যান্য সম্পদ আঘাত করার ক্ষমতা রাখি।

এই দ্বীপগুলোকে ডুবানো যায় না তাই মার্কিন যুদ্ধজাহাজের নিরাপদ চলাচলের জন্য সেখানে ইরানি সামরিক অবস্থান ধ্বংস করতে হবে। বিশেষ করে যদি খারগ দ্বীপে মার্কিন যদি অবতরণ করতে চায় তবে এই কৌশল অনিবার্য। হাওয়াই ভিত্তিক বিশ্লেষক কার্ল শুস্টার বলেছেন, এই দ্বীপগুলো এমনভাবে অবস্থিত যা উপসাগর ত্যাগ বা প্রবেশের যেকোনো শিপিং নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। তবে মার্কিন সেনারা কবে এই দ্বীপে আকাশ এবং জলজ উভয় পথেই আক্রমণ শুরু করবে তার এখনো কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।

গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন তারা ইরানের শক্তি অবকাঠামোর ওপর আঘাত শুরু করার সময়সীমা ১০ দিন বাড়িয়ে এপ্রিল ৬ পর্যন্ত নির্ধারণ করেছেন যাতে সম্ভাব্য চুক্তি মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করা যায়।

সেক্রেটারি অফ স্টেট মার্কো রুবিও সাংবাদিকদের বলেছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে। তবে সামরিক অভিযানের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে কোনও বিরতি ঘোষণা করা হয়নি। প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা চালিয়ে যাবে।

তবে. সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলেছে, প্রায় ৪,০০০ মার্কিন সৈন্য মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হচ্ছে। এছাড়াও আরো ১,০০০ সৈন্যকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ইরানের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা দ্বীপগুলো দখলের জন্য এই সৈন্যদের পূর্ণ সামর্থ্য প্রয়োজন হতে পারে। আকাশ এবং সমুদ্র এই দুই উপায়ে দ্বীপে পৌঁছাতে পারে মার্কিন সৈন্যরা। সৈন্য ও সরঞ্জাম নিয়ে সৈকতে পৌঁছতে সক্ষম এমন ল্যান্ডিং ক্রাফট সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে মার্কিন নৌবাহিনী। তবে, উপসাগরে প্রবেশের পথে হরমুজ, লারাক, কেশম ও হেংগামসহ মূল ভূখণ্ডের ইরানি প্রতিরক্ষা পার হতে হবে।

সেনা বিশ্লেষক সেড্রিক লেইটন বলেছেন, লারাক দ্বীপটি নৌযান চলাচলের জন্য বড় সমস্যা। ছোট হামলাকারী নৌকা বা ক্ষেপণাস্ত্র থেকে এটি উপসাগরের যেকোনো প্রবেশ পথ বন্ধ করতে পারে। সৈন্যদের ওপর ড্রপ শেল পরিকল্পনা থাকলেও সমুদ্রের তুলনায় সরঞ্জামের পরিমাণ সীমিত।

অভিযান সফল হলে দ্বীপ দখল দুই দিন থেকে দুই সপ্তাহ সময় নেবে। শুস্টার বলেছেন, এটি নেওয়া হলে, রাডার ও সৈন্য বসিয়ে, প্রণালী তদারকি করা যাবে এবং ড্রোন স্টেজিং ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ রোধ করা সম্ভব।
ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অফ ওয়ার জানিয়েছে, মার্কিন বা ইসরায়েলি বিমান ইতোমধ্যেই আবু মুসা, গ্রেটার তুনব ও লেসার তুনবের সামরিক অবকাঠামো আক্রমণ শুরু করেছে। তবে দ্বীপ দখল করতে প্রায় ১,৮০০–২,০০০ সৈন্যের একটি বাহিনী প্রয়োজন, যাতে দ্বীপ পুনরায় ইরান ব্যবহার করতে না পারে। এই সৈন্যদের ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও আর্টিলারি আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে হবে, তা না হলে দীর্ঘমেয়াদি সংঘর্ষ ও মার্কিন হতাহতের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।

এক্ষেত্রে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের অস্তিত্ব থাকলে, তারা দ্বীপের যে কোনও শত্রু বাহিনীকে আঘাত করবে। তবে নিম্ন উপসাগরের তিনটি দ্বীপ দখল করা খারগের তুলনায় সুবিধাজনক। কারণ খারগে বেশি তেল প্রবাহিত হয়, তাতে আঘাত হলে যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন বহু বছর পিছিয়ে যেতে পারে। তবে আবু মুসা, গ্রেটার ও লেসার তুনব দখলের পরও যুদ্ধোত্তর প্রভাব থাকতে পারে।

১৯৭১ সালে ইরান এই দ্বীপগুলো নিয়ন্ত্রণ নেয়। যদিও সংযুক্ত আরব আমিরাত এখনও এটাকে অবৈধ বলে চ্যালেঞ্জ করছে এবং বিষয়টি নিয়ে সংলাপের প্রস্তাব দিচ্ছে। তবে দ্বীপগুলোর ওপর ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক অধিকার দাবি করছে ইরান। সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, আলোচনার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান না হলে আন্তর্জাতিক আদালতে যাবে তারা। যুক্তরাষ্ট্র ও বেশ কয়েকটি দেশ আমিরাতের দাবিকে সমর্থন করেছে।

সেক্ষেত্রে এই দ্বীপগুলোর যে কোনো মার্কিন দখল রাজনৈতিক দিককে আরো জটিল করবে। যদি দ্বীপগুলোকে নতুন ইরানি সরকারের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয় তবে আমিরাত তাতে ক্ষুব্ধ হবে। আর যদি আমিরাতেকে ফেরত দেওয়া হয়, নতুন ইরানি সরকারের বৈধতা কমতে পারে।

Share this news as a Photo Card

Share and Enjoy !

Shares

০৯ নভেম্বর ২০২৫

সেনাবাহিনীর সদস্যদের মাঠ থেকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে না : স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

www.janadristi.com