একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন কেবল মেগা অবকাঠামো নির্মাণ, সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি কিংবা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) সাময়িক পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি হলো শ্রম ও মূলধনের উৎপাদনশীলতা (productivity), বেসরকারি বিনিয়োগ, দক্ষ মানবসম্পদ, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ব্যবসায়িক পরিবেশের নিশ্চয়তা। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ পোশাক খাত, প্রবাসী আয় ও নগরায়ণের ওপর ভর করে চোখে পড়ার মতো অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে সাম্প্রতিক উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংকিং খাতের বিপুল খেলাপি ঋণ এবং মেগা প্রকল্পে ব্যয়ের অর্থনৈতিক প্রতিদানের প্রশ্নটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—আমাদের ঐতিহ্যবাহী প্রবৃদ্ধির মডেলটি এখন কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। এই প্রবন্ধে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব রক্ষা এবং ব্যয়-ভিত্তিক মডেল থেকে উৎপাদনশীলতা-ভিত্তিক মডেলে পদার্পণের প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিয়ে সহজ ভাষায় বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
১. প্রবৃদ্ধির সংখ্যা বনাম প্রবৃদ্ধির গুণগত মান: আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে?
জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধি একটি দেশের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের অন্যতম প্রধান সূচক হলেও, এটি সম্পূর্ণ চিত্র প্রকাশ করে না। উদাহরণস্বরূপ, দুটি দেশ যদি সমপরিমাণ সরকারি অর্থ ব্যয় করে, তবে যার প্রাতিষ্ঠানিক মান ও প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা বেশি, সেই দেশের জনগণ অনেক বেশি সুফল পাবে।
অর্থনৈতিক তত্ত্ব অনুযায়ী প্রবৃদ্ধির সমীকরণটি অত্যন্ত সরল: প্রবৃদ্ধি = মূলধন সঞ্চয়ন + শ্রম + উৎপাদনশীলতা। কিন্তু বাস্তবে এই সমীকরণটি নির্ভর করে দেশের আইনের শাসন, জ্বালানি নিরাপত্তা, আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা এবং নীতিগত নিশ্চয়তার ওপর। প্রতিষ্ঠান ভালো হলে বিনিয়োগ আসে, আর বিনিয়োগের সঙ্গে প্রযুক্তি ও দক্ষতার সংমিশ্রণে প্রবৃদ্ধি টেকসই হয়।
২. আইনের শাসন: অর্থনীতির অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী অবকাঠামো
আমরা সাধারণত রাস্তাঘাট, সেতু ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে অবকাঠামো বলি। তবে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান অদ দৃশ্যমান অবকাঠামো হলো ‘আইনের শাসন’ (Rule of Law)। একজন বিনিয়োগকারী যখন কোনো দেশে অর্থ বিনিয়োগ করেন, তখন তিনি কেবল করের সুবিধা বা বাজারের আকার দেখেন না; তিনি নিশ্চিত হতে চান তাঁর সম্পত্তির নিরাপত্তা কতটা, চুক্তির আইনি বাধ্যবাধকতা (contract enforcement) রক্ষা করা সম্ভব কি না এবং বিচার প্রক্রিয়া কতটা দ্রুত। আমাদের দেশের অর্থনীতির বড় একটি হিসাব চাপা পড়ে যায় স্বীকৃতিহীন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রচলিত ট্যাক্স ব্যবস্থার আওতায় না আসায়। ফুটপাথ ও রাস্তার পাশে ভেন্ডর, নিবন্ধনহীন যানবাহন হতে যে পরিমাণ চাঁদা আদায় করা হয়, সেটি যদি না ঘটে বরং চাঁদাবাজি বন্ধ করে এসকল কার্যক্রমকে ট্যাক্সের আওতায় আনা যেতো, তাহলে রাজস্ব আদায় বাড়তো, বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেতো।
ঝুঁকি ও আইনি জটিলতা বাড়লে লেনদেন ব্যয় (transaction cost) বাড়ে এবং নতুন বিনিয়োগ থমকে যায়। আর বিনিয়োগ কমে গেলে সরকারের ভবিষ্যৎ কর সংগ্রহের ক্ষেত্রও সংকুচিত হয়ে পড়ে। তাই বাণিজ্য বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি, চুক্তি প্রয়োগে কঠোরতা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
৩. জ্বালানি নিরাপত্তা: মূল্যস্ফীতি ও সরকারি বাজেটের ওপর প্রভাব
জ্বালানি হলো সম্পূর্ণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। বিদ্যুৎ, গ্যাস বা জ্বালানি তেলের দাম কিংবা সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলে পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়ার খরচ বেড়ে যায়। বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে দুটি প্রতিক্রিয়া একসঙ্গে দেখা দেয়—উৎপাদন খরচ বাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতি (Cost-Push Inflation) সৃষ্টি হয় এবং বিশ্ববাজার থেকে চড়া দামে জ্বালানি আমদানির জন্য সরকারের রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর প্রবল চাপ তৈরি হয়।
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে হলে তিনটি বিষয় একসঙ্গে অর্জন করতে হবে: সাশ্রয়ী মূল্য (Affordability), নির্ভরযোগ্যতা (Reliability) এবং স্থায়িত্ব (Sustainability)। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি সাশ্রয়ী এলএনজি চুক্তি, অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটানো প্রয়োজন।
৪. আর্থিক খাতের সুশাসন ও খেলাপি ঋণের (NPL) সংকট
ব্যাংকিং খাতের মূল কাজ হলো সাধারণ মানুষের সঞ্চিত অর্থকে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ হিসেবে পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু সুশাসনের অভাবে যখন ঘনিষ্ঠজনকে অনিয়ম করে ঋণ প্রদান বা নিম্নমানের ঋণ বণ্টন হয়, তখন খেলাপি ঋণের (NPL) পরিমাণ মারাত্মক রূপ নেয়।
আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (IMF) সাম্প্রতিক মূল্যায়ন ইঙ্গিত দেয় যে ব্যাংকিং খাতে উচ্চ খেলাপি ঋণ (৩০% এর উপরে) এবং মূলধন ঘাটতি এখন সামষ্টিক অর্থনীতির মূল ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকের মূলধন কমে যায়, নতুন উদ্যোক্তারা ঋণ পান না এবং পরিশেষে সরকারকে জনগণের করের টাকায় ব্যাংকের মূলধন সরবরাহ করতে হয় (বেইল আউট)। সুশাসন সংস্কার ছাড়া ব্যাংকগুলোতে কেবল অর্থ ইনজেকশন দিলে সমস্যার সাময়িক উপশম হতে পারে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান আসবে না। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে Fractional Reserve Requirement বা ব্যাংকে রক্ষিত আমানতের কমপক্ষে ৩০% কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা করে অবশিস্ট অর্থ ঋণ প্রদানের নিয়ম করা উচিত। এতে গ্রাহকের আমানতকারীর স্বার্থ রক্ষা হবে।
৫. সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা (PIM): ব্যয়ের পরিমাণ নয়, প্রতিদান মুখ্য
সরকারি অর্থ ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (ADP) প্রধান উদ্দেশ্য হলো দেশের উৎপাদনশীল সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। তবে সরকারি অর্থ দিয়ে মেগা প্রকল্প গ্রহণ করলেই অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত হয় না; দেখতে হবে প্রকল্পের অর্থনৈতিক প্রতিদানের হার (economic return) কেমন (Internal Rate of Return, Benefit Cost Ratio এবং Net Present value, Ex-Post Economic Evaluation সঠিকভাবে নিরূপণ করা)।
প্রকল্পের সময়সীমা বারবার বাড়ানো, নির্মাণ ব্যয় অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়া এবং সঠিক চাহিদা নিরূপণ না করার ফলে ব্যয়ের বিপরীতে কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাওয়া যায় না। অর্থনীতিতে একে বলা হয় আইসিওআর (ICOR বা Incremental Capital-Output Ratio) বৃদ্ধি পাওয়া—অর্থাৎ সমপরিমাণ উৎপাদনের জন্য অনেক বেশি অর্থ ঢালতে হচ্ছে। সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত: ‘আমরা কত কোটি টাকা ব্যয় করেছি?’ তা নয়, বরং ‘প্রতিটি টাকায় দেশের কতটুকু অর্থনৈতিক মান বা মূল্য (economic value) যোগ হয়েছে?’
৬. ব্যবসা পরিচালনা সহজীকরণ (Ease of Doing Business)
ব্যবসায়ীদের জন্য আসল খরচ কেবল কর পরিশোধ বা ব্যাংক ঋণের সুদ নয়। তার চেয়ে বড় খরচ হলো বিভিন্ন সরকারি দপ্তর থেকে অনুমোদন পাওয়া, লাইসেন্স নবায়ন, কাস্টমস খালাস এবং লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে সময় নষ্ট হওয়া।
প্রশাসনিক জটিলতা দূর করতে ‘এক দরজায় সেবা’ (One-Stop Service) ধারণা থেকে বেরিয়ে ‘একবারের সরকার’ (Once-Only Government) মডেলে যেতে হবে—যেখানে একজন উদ্যোক্তাকে একই তথ্য বারবার বিভিন্ন সরকারি সংস্থায় জমা দিতে হবে না। সকল সেবা সমন্বিত ও ডিজিটাল করা হলে ব্যবসার খরচ একধাক্কায় অনেক কমে যাবে ( সময়, খরচ, ভ্রমণ কমানো)।
৭. দক্ষ মানবসম্পদ ও কারিগরি শিক্ষা (TVET)
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তরুণ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। তবে কেবল উচ্চশিক্ষা বা ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বাড়লেই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আসে না। বর্তমানে আমাদের শিল্প ও প্রযুক্তি খাতের জন্য উপযুক্ত কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীর চরম অভাব রয়েছে, যার ফলে তৈরি হয়েছে ‘শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের অমিল’ (Skill Mismatch)।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে কেবল বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক না রেখে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে (TVET) জাতীয় উৎপাদনশীলতা কৌশলের কেন্দ্রে আনতে হবে। ‘আমরা কতজন গ্রাজুয়েট তৈরি করেছি’—এই মানসিকতা বদলে ‘আমরা বাজারমুখী কতটুকু দক্ষতা তৈরি করতে পেরেছি’—সেই দিকে দৃষ্টি দিতে হবে।
৮. বাংলাদেশের জন্য একটি সমন্বিত নীতি রূপরেখা
সামষ্টিক অর্থনীতির প্রতিটি খাত একে অপরের সাথে গভীরভাবে যুক্ত। তাই বিচ্ছিন্নভাবে কোনো একটি সংস্কার বাস্তবায়ন করলে তা পুরোপুরি কার্যকর হয় না। একটি সমন্বিত রোডম্যাপ প্রয়োজন:
৯. উপসংহার
বাংলাদেশের অর্থনীতির পরবর্তী ধাপের মূল চালিকাশক্তি জিডিপির সংখ্যা বা ব্যয়ের পরিমাণ নয়, বরং উৎপাদনশীলতা। প্রতিটি টাকা, প্রতিটি শ্রমঘণ্টা এবং প্রতিটি মূলধনের একক থেকে আমরা কতটুকু বেশি মূল্য তৈরি করতে পারছি—তার ওপরই নির্ভর করছে আমাদের ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধি।
প্রতিষ্ঠানের মান উন্নত করা, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং স্বচ্ছ বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করাই হতে পারে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার একমাত্র নির্ভরযোগ্য পথ।
লেখক পরিচিতি : আব্দুল্লাহ আল মামুন একজন সরকারি অর্থ ও ক্রয় ব্যবস্থাপনা বিশ্লেষক। যোগাযোগের ঠিকানা: mamun.basa34@gmail.com