শরীয়তপুরের নদ-নদীতে গত কয়েক বছর ধরে ইলিশের উৎপাদন বাড়ছিল। হঠাৎ চলতি বছর ইলিশের উৎপাদন কমেছে। জেলেদের জালে ধরা পরছেনা আগের মতো ইলিশ মাছ। হাট-বাজারেও খুব বেশি দেখা মেলেনা ইলিশ মাছের। ইলিশ শিকারের সাথে জড়িত জেলেদের মুখেও নেই হাসি। সবসময় অভাব লেগে থাকে তাদের সংসারে।
শরীয়তপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, শরীয়তপুর জেলার ওপর দিয়ে পদ্মা ও মেঘনা নদী প্রবাহিত হয়েছে। নদী দুটির ৮০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে জেলেরা ইলিশ মাছ শিকার করেন। জেলায় ১৫ হাজার জেলে ইলিশ মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
ইলিশের ভরা মৌসুম জুলাই মাস হতে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত। বছরের অক্টোবর মাসে ২২ দিন চলে মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান। তখন নদীতে সকল ধরণের মাছ শিকার নিষিদ্ধ রাখা হয়। এরপর নভেম্বর হতে জুন পর্যন্ত জাটকা শিকার নিষিদ্ধ। ওই সময়ে জেলেরা ৯ ইঞ্চির ছোট ইলিশ শিকার করতে পারেন না। এরপর মার্চ-এপ্রিল ইলিশের অভয়ারণ্যে মাছ শিকার বন্ধ থাকে। এভাবে বছরের অন্তত ১০ মাস নদীতে ইলিশ শিকারের ওপর বিভিন্ন ধরণের বিধি-নিষেধ থাকে। বছরের জুলাই মাস হতে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলেরা বিনা বাধাঁ ও নির্বিঘ্নে ইলিশ শিকার করতে পারে।
মৎস্য কার্যালয় ১ জুলাই হতে ৩০ জুন পর্যন্ত উৎপাদনের বছর গননা করেন। তারা নদীর তীরবর্তী ইলিশের আড়ৎ ও মাছ শিকার করা জেলে নৌকা হতে প্রতি মাসের আমাবস্যা ও পূর্নিমার সময় দুই দিন করে চার দিন মাছ আহরণের হিসাব নেন। এরপর তা দিয়ে সারা মাসের মাছের উৎপাদনের গড় হিসাব বের করেন। তাদের হিসাব অনুযায়ী গত ১০ বছর ধরে প্রতি বছর জেলায় ইলিশের উৎপাদন বাড়ছে। ২০১৫ সালে জেলায় ইলিশর উৎপাদন হয়েছিল ২ হাজার মেট্টিক টন, ২০১৬ সালে ২ হাজার ১৭০ মেট্টিক টন, ২০১৭ সালে ২ হাজার ১৭৫ মেট্টিক টন, ২০১৮ সালে ২ হাজার ১৮০ মেট্টিক টন, ২০১৯ সালে ২ হাজার ২১০ মেট্টিক টন, ২০২০ সালে ৩ হাজার ৮৫০ মেট্টিক টন, ২০২১ সালে ৪ হাজার ৫৮০ মেট্টিক টন, ২০২২ সাল ৫ হাজার ৬৪৩ মেট্টিক টন, ২০২৩ সালে ৫ হাজার ৯০১ মেট্টিক টন, ২০২৪ সালে ৬ হাজার ৪২ মেট্টিক টন। চলতি বছরে (৩০ জুন) ৪ হাজার ১ মেট্টিক টন ইলিশের উৎপাদন হয়েছে। গত ১০ বছর ধরে প্রতিবছর উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও এ বছর তা কমেছে। গত বছর হতে এ বছর উৎপাদন কমেছ ২ হাজার ৪১ মেট্টিক টন।
শরীয়তপুর জেলার পদ্মা ও মেঘনার ৮০ কিলোমিটার জুড়েই কম-বেশি ইলিশের বিচরণ রয়েছে। তার মধ্যে নড়িয়ার সুরেশ^র হতে গোসাইরহাটের কোদালপুর পর্যন্ত ৪০ কিলোমিটার এলাকায় ইলিশের বিশেষ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে মৎস্য বিভাগ। বর্তমানে ওই এলাকায় জেলেরা সার্বক্ষনিক ইলিশ মাছ শিকার করেন। জেলার জাজিরা, নড়িয়া, ভেদরগঞ্জ ও গোসাইরহাট উপজেলার ২২টি ইউনিয়নের অন্তত ৬০টি গ্রামের বাসিন্দারা পদ্মা ও মেঘনা নদীতে ইলিশ মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
ভেদরগঞ্জের কাঁচিকাটা এলাকার জেলে ইয়াছিন সরকারের বয়স ৫৫ বছর। ৪০ বছর ধরে পদ্মা নদীতে ইলিশ মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেন। স্ত্রী ও চার সন্তান নিয়ে সংসার চালতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। তিনি বলেন, আমার দাদার হাত ধরে বাবা নদীতে মাছ শিকারে নেমেছেন। বাবার হাত ধরে আমি নেমেছি। একটি ছোট ইঞ্জিন চালিত নৌকায় ৪ জন সহকারি নিয়ে মাছ শিকার করি। বছরের ১০ মাস নানা ধরণের বাঁধা নিষেধের মধ্যে মাছ শিকার করতে হয়। নদীতে আগের মত ইলিশ পাওয়া যায় না। কোন সময় এমন হয় দিন-রাতেও একটি মাছ পাইনা। তখন তেল খরচ ও শ্রমিকদের মুজরি পকেট থেকে ব্যয় করতে হয়। এখন যা পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে তাতে সংসার চালাতে পারছি না। নৌকা মেরামত, জাল মেরামত ও সহকারিদের টাকা পরিশোধ করার পর হাতে আর টাকা থাকে না।
নড়িয়ার চরআত্রা এলাকার জেলে দিদারুল ইসলামের পরিবারের সদস্য ৬ জন। স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে দুই সন্তান পড়ালেখা করছে। সন্তানদের পড়ালেখা ও সংসারের সারা বছরের খরচ করতে তার প্রয়োজন ৩ লাখ হতে সাড়ে ৩ লাখ টাকা। প্রতি বছর মাছ শিকারের জন্য নৌকা ও জাল মেরামতে প্রয়োজন আরো ১ লাখ টাকা। কিন্তু দিদারুলের এখন আর সেই আয় নেই। তাই দিদারুল দাদন নিয়ে সংসার চালান, নৌকা-জাল মেরামত করেন।
দিদারুল বলেন, দিনরাত ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে নদীতে থাকতে হয়। কখনো নদীতে না গেলে আড়ৎ মালিক (যার কাছ থেকে দাদন নেয়া) চাপ সৃষ্টি করেন। মাছ শিকারের পর তা অন্যত্র বিক্রির স্বাধীনতাও নেই। সাথে সাথে আড়ৎদারের কাছে নিয়ে আসতে হয়। তিনি যা বিক্রি করেন তা হতে তার কমিশন রেখে বাকি টাকা দেন। এভাবে আর চলতে পারছি না। নদীতে মাছ নেই, তারওপর আড়ৎদারের চাপ।
নড়িয়ার সুরেশ^র মাছঘাটের ব্যবসায়ী মোকলেছ মোল্যা বলেন, সুরেশ^র জেলার একটি শীর্ষ ইলিশ মাছ বিক্রির বাজার। দুই বছর ধরে জেলেদের জালে তেমন ইলিশ মাছ ধরা পরছে না। নদীতে খুবই কম পরিমান মাছ পাওয়া যাচ্ছে। যাও পাওয়া যায় তার অনেক দাম। ৮০০ গ্রাম হতে ১ কেজি ২০০ গ্রাম সাইজের ইলিশ মাছ বর্তমানে ২ হাজার ২০০ টাকা হতে ২ হাজার ৫০০ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। তার ছোট সাইজের মাছ ৮০০ টাকা হতে ১৮০০ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। ইলিশ এখন ধনিদের খাবার হয়েছে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ এখন আর ইলিশ মাছ কিনতে পারেন না।
জেলা মৎস কর্মকর্তা বিশ^জিৎ কুমার দেব বলেন, গত ১০ বছর ধরে ইলিশ মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছিল। চলতি বছর মাছের উৎপাদন কমেছে। এবছর দামও অন্যান্য বছরের তুলনায় একটু বেশি। কি কারণে ইলিশের উৎপাদন কমছে তা চিহ্নিত করে তার সমাধানের চেষ্টা করা হবে।