Saturday, 24th October, 2026

শরীয়তপুরে চাঞ্চল্যকর নিবিড় হত্যা মামলায় দুই আসামীর মৃত্যুদন্ড

শরীয়তপুরে এক শিশু শিক্ষার্থী হত্যাকান্ডের ঘটনায় দুই ব্যক্তির মৃত্যুদন্ড দিয়েছেন আদালত। ওই মামলায় আরেক আসামীকে ১০ বছরের আটকাদেশ দেয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) শরীয়তপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক শেখ হাফিজুর রহমান দুপুরে এ রায় দিয়েছেন।
মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত দ্ইু আসামী হলেন, শাকিল হোসেন গাজী (১৯), সিয়াম হোসেন (২০) ও ১৬ বছর বয়সি কিশোরকে ১০ বছর আটকাদেশ দেয়া হয়েছে।
নিবিড় শরীয়তপুর সদর উপজেলার ডোমসার ইউনিয়নের খিলগাঁও গ্রামের মনির হোসেন খানের ছেলে ও শিশু কানন কিন্ডারগার্টেন স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন।
আদলাত সূত্র জানায়, শরীয়তপুর সদর উপজেলার খিলগাঁও এলাকার মনির খানের ছেলে হৃদয় খান ওরফে নিবিড়-২০২৩ সালের ৩১ জুলাই নিখোঁজ হয়। স্বজনরা তাকে খুঁজে না পেয়ে ওই দিন রাতে পালং মডেল থানায় একটি জিডি করে। ওই রাতেই দুর্বৃত্তরা তাকে অপহরণ করা হয়েছে বলে তার মা নিপা আক্তারের মুঠোফোনে ফোন করে জানায়। এরপর তাকে ছেরে দেয়ার জন্য ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছিল। মুক্তিপন চাওয়া মুঠোফোন নম্বরের সূত্র ধরে পুলিশ ওই রাতেই সদর উপজেলার খিলগাঁও এলাকার শাকিল হোসেন গাজী, পাবনার সিংঙ্গা এলাকার সিয়াম হোসেন ও খিলগাঁও এলাকার ১৬ বছর বয়সি এক কিশোরকে আটক করে। তাদের দেয়া স্বীস্কারোক্তি অনুযায়ী হৃদয়ের বাড়ির পাশের একটি ইটভাটা হতে মাটিচাপা দেয়া অবস্থায় তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এরপর আসামীরা আদালতে স্বীকার করেছেন হৃদয়কে শ^াসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার পর তারা মুক্তিপনের জন্য ফোন করেছিলেন। মামলাটি প্রথমে পালং মডেল থানার এক কর্মকর্তা তদন্ত করেছেন। এরপর ওই মামলাটি পিবিআই তদন্ত করে-২০২৪ সালের ১ জুন আদালতে অভিযোগপত্র দায়ের করেন। দীর্ঘ দুই বছর পাঁচ মাস পর ২১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে মঙ্গলবার দুপুরে শরীয়তপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক শেখ হাফিজুর রহমান অভিযুক্ত শাকিল হোসেন গাজী ও সিয়াম হোসেনকে মৃত্যুদণ্ড ও আরেক ১৬ বছর বয়সী কিশোর আসামীকে তিনটি ধারায় ২১ বছরের আটকাদেশ দেয়া হয়েছে। এদিকে রায়ে দুই আসামীর মৃত্যুদন্ডে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন পরিবার ও বাদী পক্ষের আইনজীবী।
রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন নিহত হৃদয় খানের মা নিপা আক্তার। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, টাকার জন্যই আমার ছেলেকে হত্যা করেছে তারা। আড়াই বছর ধরে সন্তানের জন্য হাহাকার করছি। একটি রাতও শান্তিতে ঘুমাতে পারিনি। তিনি আরও বলেন, রায়ে একজনকে শিশু বলা হয়েছে, কিন্তু সে মূলত শিশু নয় হত্যার পরিকল্পনাকারী। তার বিষয়ে দেওয়া রায়ে আমরা সন্তুষ্ট নই। এ সময় তিনি রাষ্ট্রের কাছে আবেদন জানিয়ে বলেন, আসামিরা যেন উচ্চ আদালতে গিয়ে কোনোভাবেই খালাস না পায় এবং দ্রুত রায় কার্যকর করা হয়।
এ বিষয়ে বাদীপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান রোকন বলেন, বিজ্ঞ আদালত যে রায় দিয়েছেন তাতে আমরা সন্তুষ্ট। তবে যাকে কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে, তার বিষয়ে পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সময়ে আপিল করা হবে কি না সে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পাশাপাশি তিনি এ রায় দ্রুত কার্যকরের দাবি জানান।
আর আসামি পক্ষের আইনজীবী (স্টেট ডিফেন্স) অ্যাডভোকেট ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, এই মামলার রায়ে আমরা সংখুদ্ধ। মামলার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আলামত (এভিডেন্স) টেম্পারিং করা হয়েছে বলে তিনি জানান। শুধুমাত্র ১৬৪ ধারার জবানবন্দির ভিত্তিতে মামলাটি বিচারে নেওয়া হয়েছে। বাদীপক্ষ নারাজি দিলেও তা রহস্যজনক ভাবে গুরুত্ব পায়নি। মামলার মূল আসামি শাওন চৌকিদারকে পরিকল্পিতভাবে সাক্ষ্যপ্রমাণের বাইরে রাখা হয়েছে। যারা প্রকৃত অপরাধী নয়, তাদেরই বেশি শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এ মামলায় কোনো ডিজিটাল ও ফরেনসিক ইভিডেন্স নেই, কোনো প্রত্যক্ষদর্শীও নেই। ২১ জন সাক্ষীর কেউই ঘটনাটি চোখে দেখেননি। এরপরও এক ও দুই নম্বর আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ায় আমরা গভীরভাবে হতাশ। রায়ের বিরুদ্ধে আমাদের মক্কেলদের আপত্তি রয়েছে এবং এ বিষয়ে আমরা উচ্চ আদালতে আপিল করব।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনাল রাষ্ট্র পক্ষের আইনজীবী (পিপি) কামরুল হাসান বলেন, মামলাটিতে একজনের বিচার হয়েছে শিশু আদালতে। তাকে ১০ বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়েছে। আর দুইজনের বিচার হয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে। তাদের দুই জনকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ সর্বোচ্চ শাস্তির জন্য আবেদন করেছিল। আদালত এমন রায় দেয়ায় আমরা সন্তুষ্ট।