Monday, 26th October, 2026

অশ্রুশিক্ত নয়নে আবুল কালামকে শেষ বিদায় জানাল গ্রামের মানুষ

পদ্মার ইলিশ খুব পছন্দ ছিল আবুল কালাম ও তার দুই সন্তানের। তাইতো বাড়িতে বসবাস করা ভাবি আসমা বেগমকে ফোন করে ইলিশ মাছ কিনে রাখতে বলেছিলেন। সপ্তাহের শেষে গ্রামে এসে সেই ইলিশ মাছ সন্তানদের জন্য নারায়নগঞ্জ নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু আবুল কালম গ্রামে ফিরেছেন, নিথর দেহে লাশবাহী গাড়িতে চড়ে। তার এমন করুন পরিনতি মানতে পারছেন না স্বজন ও গ্রামের মানুষেরা। সোমবার (২৭ অক্টোবর) সকালে তাদের প্রিয় আবুল কালমকে অশ্রুশিক্ত নয়নে চির বিদায় জানাল স্বজন ও ঈশ্বরকাঠি গ্রামের মানুষেরা।
রোববার রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় মেট্রোরেলের পিলারের একটি বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে তার নিচে চাপা পরে নিহত হয়েছেন আবুল কালাম। তিনি শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার মোক্তারের চর ইউনিয়নের ঈশ্বরকাঠি গ্রামের মৃত জলিল চোকদার ও হনুফা বেগম দম্পতির ছেলে।
আবুল কালামের বড় ভাইয়ের স্ত্রী আসমা বেগম সোমবার সকালে বাড়ির উঠানে বসে কাঁদছিলেন আর দেবরের নানা স্মৃতিচারণ করছিলেন। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, শ^শুর-শাশুড়ি মারা যাওয়ার পর ওকে সন্তানের মত মানুষ করেছি। সেও আমাকে মায়ের স্থান দিয়েছিল। গতকাল (রোববার) বেলা ১১টার দিকে ফোন করে বলেছিল নদীতে ইলিশ মাছের অভিযান শেষ হয়েছে, আমার জন্য কিছু ইলিশ মাছ কিনে রেখো। আমি বৃহস্পতিবার এসে তা নিয়ে যাব। ওর বৃহস্পতিবার আসার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই সে চলে এসেছে লাশ হয়ে। কে জানত এটাই ওর সাথে আমার শেষ কথা হবে। আমরা এই কষ্ট কোথায় রাখব?
আবুল কালামের পরিবারের সদস্যরা জানান, আবুল কালাম স্ত্রী ও দুই শিশু সন্তান নিয়ে নারায়ণগঞ্জের পাঠানটুলি এলাকায় বসবাস করতেন। ঢাকার মতিঝিলের একটি ট্রাভেল এজেন্সির সাথে কাজ করতেন। ওই কাজের জন্যই প্রতিদিন তিনি নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা যাতায়াত করতেন।
প্রতিদিনের ন্যায় রোববার সকালে নারায়ণগঞ্জের বাসা থেকে রওনা হয়ে কর্মস্থল মতিঝিলে আসেন। এরপর কাজের জন্য সেখান থেকে বের হন। রোববার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় মেট্রোরেলের পিলারের একটি বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে যায়। সেটির নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারান আবুল কালাম। এরপর টেলিভিশন ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদে পরিবারের সদস্যরা তার মৃত্যুর খবর জানতে পারেন।
তার মৃত্যুর খবর পেয়ে স্ত্রী আরিন আক্তার তার দুই শিশু সন্তান নিয়ে ঢাকার সোহরোওয়ার্দি হাসপাতালে ছুটে যান। সেখানে আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাতে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় নারায়নগঞ্জের পাঠানটুলি এলাকায়। সেখানে প্রথম নামাজে জানাজা শেষ করে গভীর রাতে গ্রামের বাড়িতে আনা হয়।
আবুল কালামের কফিনবাহী গাড়িটি রাত ২টার দিকে ঈশ্বরকাঠি গ্রামে পৌঁছায়। এ সময় গ্রামে থাকা পরিবারের সদস্যরা ও গ্রামের মানুষ কান্নায় ভেঙে পরেন।
সোমবার আবুল কালামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের মানুষ তার কফিনে শ্রদ্ধা জানাচ্ছে। তাকে শেষ বিদায় ও এক নজর দেখার জন্য গ্রামের মানুষ ভির করেছেন। সকলের চোখেই অশ্রু। পরিবারের সদস্যরা বাড়ির উঠানে বসে কান্না করছেন। স্ত্রী আইরিন আক্তার শিশু সন্তান কোলে নিয়ে এদিক সেদিক ছুটছেন আর কান্না করছেন। স্বজনরাও তাকে শান্তনা দিতে পারছেন না।
শিশু সন্তান কোলে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে আইরিন আক্তার বলেন, গতকাল সে যখন বাসা থেকে বের হয় তখন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তিনি চলে যাওয়ার পরও আমি দরজা বন্ধ করতে পারছিলাম না। জানিনা তখন কেন যেন আমার বুক ফেটে কান্না পাচ্ছিল। আগেতো কখনো এমন হযনি। এখন আবুল কালাম আমাকে সারা জীবনের জন্য কান্না উপহার দিয়ে চলে গেল। আমি শিশু দুই সন্তান নিয়ে কোথায় দাড়াব? কে আমাদের পাশে থাকবে?
ঈশ্বরকাঠি গ্রামটি নড়িয়া উপজেলা সদর হতে ২ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। পদ্মা ও কীর্তিনাশা নদীর তীর ঘেষা গ্রামটি নির্মল ও শান্ত। সেই গ্রামটিতে আজ বইছে শোকের মাতম। গ্রামের পূর্ব পোরাগাছা ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা মাঠে সকাল ৯টার দিকে আবুল কালামের দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর গ্রামের মানুষ তাদের প্রিয় স্বজনের মরদেহ কাঁধে করে নিয়ে যান উপজেলা সদরে। সেখানে পৌর কবরস্থানে সকাল ১০টার দিকে তাকে দাফন করা হয়। জানাজায় ও দাফনে অংশ নেয়া আত্মীয়-স্বজন ও এলাকার মানুষ চোখের জল ফেলে কান্না করেন।
ইশ্বরকাঠি গ্রামের বাসিন্দা নাঈম চোকদার বলেন, আবুল কালাম ভাই ভদ্র ও শান্ত স্বভাবের হওয়ায় এলাকায় খুব জনপ্রিয় ছিল। সকলের সাথে তার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। তার এমন অকাল মৃত্যুর ঘটনাটি আমরা মানতে পারছি না।
নড়িয়া উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা আব্দুল কাইয়ুম খান বলেন, মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নড়িয়ার যে যুবকের মৃত্যু হয়েছে তার মরদেহ রাতেই গ্রামে আনা হয়েছে। সকালে জানাজা শেষে উপজেলা সদরে দাফন করা হয়েছে। গ্রামে লাশ গ্রহণ ও দাফন কাজ সম্পন্ন পর্যন্ত সহকারি কমিশনারের (ভূমি) নেতৃত্বে কয়েকজন উপজেলা পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাকে নিয়োজিত করা হয়েছিল। দাফনের সকল কাজ তারা সমন্বয় করেছেন। এছাড়া ঐ পরিবারটির পাশে উপজেলা প্রশাসন সবসময় থাকবে। আর তার পরিবারকে সহায়তা করার বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যাযে আলোচনা হচ্ছে।