Wednesday, 21st October, 2026

প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে শরীয়তপুর জেলা প্রশাসনের কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা

একটি প্রগতিশীল, বৈষম্যহীন এবং জ্ঞানভিত্তিক টেকসই সমাজ বিনির্মাণের মূল সোপান হলো প্রাথমিক শিক্ষা। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের দূরদর্শী শিক্ষানীতির আলোকে শরীয়তপুর জেলায় প্রাথমিক পর্যায়ে শতভাগ শিক্ষার্থীর ভর্তি নিশ্চিতকরণ এবং ঝরে পড়ার হার হ্রাস বিগত বছরগুলোতে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জিত হয়েছে। সংখ্যামূলক এই অর্জন নিঃসন্দেহে একটি দৃঢ় প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি প্রদান করে। তবে সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রশাসনিক নিরীক্ষা ও মাঠপর্যায়ের নিবিড় পর্যবেক্ষণে প্রতীয়মান হয়েছে যে, সংখ্যাগত এই অগ্রগতি সত্ত্বেও শিক্ষার গুণগত মান এখনও কাঙ্খিত স্তরে উন্নীত করা সম্ভব হয়নি। নিবিড় গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ও ফলপ্রসূ একাডেমিক তদারকির অনিয়মিত চর্চার কারণে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান প্রক্রিয়া তার কাঙ্খিত কার্যকারিতা হারাচ্ছে। এই প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা দূরীকরণ, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বুনিয়াদি শিক্ষাগত যোগ্যতা সুদৃঢ় করা এবং শ্রেণিকক্ষকে আনন্দময় শিক্ষণ কেন্দ্রে রূপান্তরের লক্ষ্যে জেলা প্রশাসন, শরীয়তপুর একটি সমন্বিত ও বহু-অংশীজনভিত্তিক কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে, যা মাঠপর্যায়ে সফলভাবে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
কৌশলগত কর্মপরিকল্পনার মূল দিকসমূহ :
বুনিয়াদি ভাষাগত ও গাণিতিক দক্ষতা অর্জন কৌশল: শিক্ষার্থীদের পঠন দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিটি কার্যদিবসে প্রতিটি শ্রেণির প্রথম ২০ মিনিট সময় শুদ্ধ উচ্চারণসহ বাংলা ও ইংরেজি পড়ার জন্য নির্দিষ্ট করা যেতে পারে। একই সাথে, শিক্ষকমণ্ডলীর জন্য শ্রেণিকক্ষে সর্বদা ‘প্রমিত বাংলা ভাষা’ ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। হাতের লেখা সুন্দর করার জন্য দৈনিক লিখন অনুশীলনের পাশাপাশি প্রতি শ্রেণিকক্ষে ইংরেজি শব্দভাণ্ডার বাড়াতে `Word of the Day’ লিখে রাখা যেতে পারে। গণিতে দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ প্রতিকারমূলক ক্লাসের ব্যবস্থা এবং প্রতি মাসে ‘গণিত কুইজ’ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যেতে পারে।
আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতি ও সৃজনশীলতার সমন্বয়: একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সনাতন পদ্ধতির বদলে প্রযুক্তি ও সৃজনশীলতার মিশ্রণ ঘটানো সম্ভব। সপ্তাহে অন্তত একদিন মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের মাধ্যমে বাস্তবসম্মত শিক্ষণীয় ভিডিও প্রদর্শন করা যেতে পারে। শিশুদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে “The Creative Wall” বা দেয়ালিকা স্থাপন এবং মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করতে ‘শশুতোষ লাইব্রেরি কর্নার’ গড়ে তোলা যেতে পারে। পাশাপাশি, শিক্ষকদের সফল শিক্ষণ-পদ্ধতিসমূহ একে অপরের মধ্যে বিনিময়ের জন্য একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা যেতে পারে।
প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা, জবাবদিহিতা ও মোটিভেশন: শিক্ষার্থীদের সময়ানুবর্তিতা ও নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে কঠোর তদারকি করা যেতে পারে। শিক্ষক ও অভিভাবকের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য ‘মতামত বই’ বা কমেন্ট বুক চালু করা যেতে পারে। প্রাত্যহিক সমাবেশে পর্যায়ক্রমে একজন শিক্ষার্থীকে “(Student of the Day)” নির্বাচন করে তার মাধ্যমে দিনের গুরুত্ব উপস্থাপন ও তাকে ক্লাস ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব দিয়ে নেতৃত্বগুণের বিকাশ ঘটানো যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের ছোট ছোট সাফল্যের জন্য `Star of the Week’ প্রশংসা বোর্ড এবং দিনের শেষে ৩ মিনিটে “আজ আমি কী শিখলাম” শিরোনামে সারাদিনের শিখনফল পুনরালোচনার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।
পরিবেশগত পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্য-সচেতনতা ও অবকাঠামো: বিদ্যালয়কে আকর্ষণীয় করতে পর্যায়ক্রমে ছোট আকারের প্লে-গ্রাউন্ড স্থাপন, স্যানিটেশন ব্যবস্থা সর্বদা ব্যবহারোপযোগী রাখা এবং দৃশ্যমান ডাস্টবিন স্থাপন নিশ্চিত করা যেতে পারে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের সরাসরি অংশগ্রহণে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি ও তা পরিচর্যার দায়িত্ব শ্রেণি অনুযায়ী বন্টন করে দেওয়া যেতে পারে।
মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন রূপরেখা:
এই কর্মপরিকল্পনাকে কেবল কাগজের দলিলে সীমাবদ্ধ না রেখে মাঠপর্যায়ে এর কার্যকর ও সফল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জেলা প্রশাসন, শরীয়তপুর একটি নিবিড় ও সময়াবদ্ধ রোডম্যাপ গ্রহণ করেছে। এরই অংশ হিসেবে গত ৪ মার্চ, ২০২৬ থেকে ১২ মার্চ, ২০২৬ পর্যন্ত মোট ০৬টি কার্যদিবসে শরীয়তপুর জেলার ০৬টি উপজেলার সর্বমোট প্রায় ৩,২০০ জন সহকারী শিক্ষকের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে ব্যাপকভিত্তিক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। উক্ত সভাসমূহে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কর্মপরিকল্পনার লক্ষ্যসমূহ বিশদভাবে উপস্থাপন করা হয় এবং তা কীভাবে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। ৩,২০০ জন শিক্ষকের এই বিশাল সাড়া ও উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, মাঠপর্যায়ের শিক্ষকমণ্ডলী এই সংস্কারকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন। এই সামগ্রিক অগ্রগতিকে টেকসই করতে প্রতি মাসে অন্তত একদিন শ্রেণিভিত্তিক ‘শিক্ষক-অভিভাবক সভা’ আয়োজন করা যেতে পারে।
সর্বপরি, প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত রূপান্তর কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের খণ্ডিত প্রচেষ্টায় সম্ভব নয়, এটি একটি সুসংহত প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক আন্দোলন। জেলা প্রশাসন, শরীয়তপুর কর্তৃক প্রণীত এই সমন্বিত কর্মপরিকল্পনাটি মাঠপর্যায়ের বাস্তব চাহিদা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাকে বিবেচনায় নিয়ে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত উপায়ে প্রণয়ন করা হয়েছে। ৩,২০০ জন সহকারী শিক্ষকের উদ্বুদ্ধকরণ এবং তাদের পেশাগত দায়বদ্ধতা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে যে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা শরীয়তপুরের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। শিক্ষার বুনিয়াদি স্তরের এই গুণগত সংস্কার আগামী দিনে শরীয়তপুর জেলাকে প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি অনন্য মডেল জেলায় রূপান্তরিত করতে পারে।
আমি বিশ্বাস করি- ‘করবো কাজ গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে জেলা প্রশাসনের এই কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে শরীয়তপুর জেলার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক এবং যুগোপযোগী করে তোলা সম্ভব হবে।

লেখক:
তাহসিনা বেগম
জেলা প্রশাসক, শরীয়তপুর।