বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বাজেটের প্রায় অর্ধেকই দুর্নীতি, অপচয় ও অব্যয়ে নষ্ট হয়ে যায় বলে উল্লেখ করেছেন হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের পরিচালক এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী।
বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) দুপুরে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) মিলনায়তনে দুর্নীতি মুক্ত স্বাস্থ্য আন্দোলন আয়োজিত ‘সর্বস্তরে স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতে চাই দুর্নীতি মুক্ত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান আলোচকের বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, স্বাস্থ্যখাতে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয় তার মাত্র অল্প অংশ মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়, বাকিটা হারিয়ে যায় অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া ও দালাল-ঠিকাদার চক্রের লুটপাটে। বাজেট বরাদ্দ বাড়ালেও সেবার মান বাড়ে না, কারণ বরাদ্দের ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ ব্যয়ই হয় না। আরও অন্তত ৩০ শতাংশ সরাসরি দুর্নীতিতে হারিয়ে যায়।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাজেটের কমবেশি ৫৫ শতাংশ অপচয় ও দুর্নীতিতে হারিয়ে যাচ্ছে। বাকি টাকায় এ দেশের ১৮ কোটি মানুষকে চিকিৎসা দিতে হয়, এটা আদৌ সম্ভব নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য বাজেট বরাদ্দের সুপারিশ করলেও বাংলাদেশে বরাদ্দ মাত্র ০.৬৯ শতাংশ। আর সে সামান্য বরাদ্দের বড় অংশই গায়েব হয়ে যায়।
এ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, হাসপাতালগুলোতে আসল চাহিদা যাচাই না করে মনগড়া তালিকা করে যন্ত্রপাতি পাঠানো হয়, যার অনেকগুলো ব্যবহারই সম্ভব হয় না। দেখা গেছে, যে উপজেলায় বিদ্যুতের সংযোগই ছিল না, সেখানে এক্সরে মেশিন পাঠানো হয়েছে। পুরো বাক্সই খোলা হয়নি আর। কিন্তু দামটা ঠিকই ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়েছে। কয়েক লাখ টাকার ডেন্টাল চেয়ার ৫৬ লাখ টাকায় কেনা, একই মেশিন এক হাসপাতালে ১৮ লাখে আরেক হাসপাতালে ৫৬ লাখে কেনার মতো ঘটনা কীভাবে ঘটে? করোনা মহামারির সময় ৪০ হাজার কোটি টাকার ভ্যাকসিন কেনার হিসাব এখনো প্রকাশ হয়নি, এটা রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার আড়ালে দুর্নীতির আবরণ।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত সরকার কখনোই চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট, অ্যানেস্থেটিস্ট বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঠিক সংখ্যাগত চাহিদা নির্ধারণ করে কোনো জাতীয় পরিকল্পনা তৈরি করেনি। স্বাস্থ্যসেবা একটি টিমওয়ার্ক। কিন্তু আমাদের দেশে কতজন ডাক্তার, কতজন নার্স বা টেকনোলজিস্ট প্রয়োজন, সরকার জানে না, আমরাও জানি না। দেশে মাত্র ৫২–৫৩ জন আইসিইউ বিশেষজ্ঞ আছেন, অথচ সরকারি ডাক্তারদের বেসরকারি প্র্যাকটিস নিষিদ্ধ করার দাবি নিয়ে অনেকেই বলেন। বিশেষজ্ঞ তৈরি না করে এমন নীতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।
ডা. লেলিন বলেন, সংবিধানে স্বাস্থ্যকে মৌলিক অধিকার বলা হলেও এটি ‘আইনগত অধিকার’ নয়, ফলে নাগরিক স্বাস্থ্যসেবা না পেলেও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার চাইতে পারে না। স্বাস্থ্যকে আইনগত অধিকার না করলে কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না। দুর্নীতি রোধ করা যাবে না।
তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্যখাতের অনিয়ম তদন্তে গঠিত বহু কমিশনের কোনো প্রতিবেদনই প্রকাশ হয়নি, কোনো সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি। এর পেছনে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের স্বার্থ জড়িত। দুর্নীতি রোধের জন্য সর্বপ্রথম দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং ও জবাবদিহিতা। যেদিন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী-এমপি, সচিব সবাই বাধ্য হয়ে দেশে চিকিৎসা নেবেন, সেদিনই স্বাস্থ্যব্যবস্থা পাল্টে যাবে। কারণ তখনই হাসপাতাল ভালো করার চাপ তৈরি হবে।
স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্নীতি রোধে নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও নীতিনির্ধারকদের একসঙ্গে দায়িত্ব নিতে হবে বলেও মতামত প্রকাশ করেন।
আলোচনা সভায় আলোচক হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন লায়ন ক্লাবের সাবেক ডিস্ট্রিক্ট গভর্নর আশফাকুল রহমান, হ্যালক্রো গ্রুপের সাবেক কনসালটেন্ট আশফাকুল রহমান, বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি রাশেদ রাব্বি, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল।