জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে জিলবাংলা চিনিকলে গত মৌসুমে উৎপাদিত ৩ হাজার ৬১৮ টন চিনি অবিক্রিত পড়ে রয়েছে। এসব চিনির বাজারমূল্য ৪৫ কোটি ২২ লাখ টাকা। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে অবিক্রিত অবস্থায় রয়েছে ৯০০ টন চিটাগুড়, যার মূল্য ২ কোটি ৩৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা। গুদামে বিপুল পরিমাণ চিনি মজুত থাকায় আগামী ২০২৬-২৭ মাড়াই মৌসুমে উৎপাদিত চিনি সংরক্ষণ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে মিল কর্তৃপক্ষ।
মিলসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাজারে প্রতি কেজি পরিশোধিত চিনির দাম ১০৫ থেকে ১১০ টাকা হলেও দেশীয় চিনিকলে উৎপাদিত চিনির সরকার নির্ধারিত মূল্য ১২৫ টাকা। দামের এই ব্যবধানের কারণে ডিলার ও ব্যবসায়ীরা জিলবাংলা চিনিকলের চিনি কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। ফলে উৎপাদিত চিনি বিক্রি না হওয়ায় মিলের নিজস্ব গুদামে মজুত বাড়ছে।
মিল কর্তৃপক্ষের দাবি, জিলবাংলা চিনিকলে উৎপাদিত চিনির গুণগত মান ভালো এবং স্থানীয় ভোক্তাদের মধ্যে এর চাহিদাও রয়েছে। তবে তুলনামূলক বেশি দামের কারণে ডিলাররা চিনি বাজারজাত করতে আগ্রহী হচ্ছেন না। এ অবস্থায় বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চিনি বিক্রির উদ্যোগ নিতে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের কার্যকর পদক্ষেপ চেয়েছেন তাঁরা।
মিল সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২৮ নভেম্বর শুরু হওয়া ২০২৫-২৬ মাড়াই মৌসুমে জিলবাংলা চিনিকলে ৮৪ হাজার ৯৪১ টন আখ মাড়াই করে ৫ হাজার ৩৬৮ টন চিনি উৎপাদন করা হয়। ওই মৌসুমে আখ মাড়াইয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭০ হাজার টন এবং চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ হাজার ৯০০ টন। উৎপাদিত চিনির মধ্যে বিক্রি হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৭৫০ টন। বাকি ৩ হাজার ৬১৮ টন চিনি এখনো মিলের নিজস্ব গুদামে অবিক্রিত অবস্থায় রয়েছে।
এদিকে, আগামী ২০২৬-২৭ মাড়াই মৌসুমে মিলটিতে ৭৭ হাজার টন আখ মাড়াই করে ৫ হাজার ৩৯০ টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ মৌসুমে মাঠে ৫ হাজার ১৫ একর জমিতে আখ রয়েছে। আগামী ২৭ নভেম্বর নতুন মাড়াই মৌসুমের উদ্বোধনের কথা রয়েছে।
মিল কর্তৃপক্ষ জানায়, চিনিকলটিতে নির্দিষ্ট ধারণক্ষমতার একটি গুদাম রয়েছে। আগের মৌসুমের অবিক্রিত চিনি গুদামের বড় অংশ দখল করে থাকায় নতুন মৌসুমে উৎপাদিত চিনি সংরক্ষণে জটিলতা দেখা দিতে পারে। এ কারণে মজুত চিনি দ্রুত বিক্রি করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
চিনির বাজারজাতকরণ নিয়ে স্থানীয় ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদেরও বক্তব্য রয়েছে। পোল্যাকান্দি নামাপাড়া গ্রামের আমিনুল ইসলাম বলেন, অন্যান্য চিনির তুলনায় জিলবাংলা চিনিকলের চিনির স্বাদ ভিন্ন এবং গুণগত মান ভালো। দাম কিছুটা বেশি হলেও ভোক্তারা এ চিনি কিনতে আগ্রহী। কিন্তু উপজেলা শহরের বাইরে অনেক বাজারে এটি পাওয়া যায় না। ফলে ক্রেতারা খুঁজেও না পেয়ে অন্য চিনি কিনতে বাধ্য হন।
দেওয়ানগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী গোবিন্দ বলেন, স্থানীয় ক্রেতাদের মধ্যে জিলবাংলা চিনির চাহিদা রয়েছে। এ অঞ্চলের অনেক ক্রেতা চিনির রং দেখেই এটি শনাক্ত করতে পারেন। কিন্তু নিয়মিত সরবরাহ না থাকায় তাঁদের চাহিদা অনুযায়ী চিনি বিক্রি করা সম্ভব হয় না।
জিলবাংলা চিনিকলের মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) মো. আলাউদ্দিন বলেন, বাজারে জিলবাংলা চিনির চাহিদা থাকলেও দাম বেশি হওয়ায় বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের ডিলাররা এ চিনি সরবরাহ করছেন না। এ কারণে এখনো ৩ হাজার ৬১৮ টন চিনি অবিক্রিত রয়েছে। আগামী মৌসুমের উৎপাদিত চিনি রাখার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে মজুত চিনি দ্রুত বিক্রি করা প্রয়োজন।
চিনিকলের মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) শরিফ মো. জিয়াউল হক বলেন, ভোক্তাদের চাহিদা পূরণ এবং নতুন মৌসুমের চিনি গুদামজাতকরণের সুবিধার্থে অবিক্রিত চিনি দ্রুত বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফেরদৌসুল আলম বলেন, দাম বেশি হওয়ায় ডিলাররা জিলবাংলা চিনিকলের চিনি কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। ফলে গত মৌসুমের ৪৫ কোটি ২২ লাখ টাকার চিনি অবিক্রিত রয়েছে। এসব চিনি গুদাম থেকে সরানো না গেলে আসন্ন মৌসুমে উৎপাদিত চিনি সংরক্ষণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের দ্রুত পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেন তিনি।
মিল কর্তৃপক্ষের মতে, অবিক্রিত চিনি ও চিটাগুড় দ্রুত বাজারজাত করা গেলে একদিকে গুদামের জায়গা খালি হবে, অন্যদিকে নতুন মৌসুমের উৎপাদিত চিনি সংরক্ষণ সহজ হবে। তাই মজুত পণ্য বিক্রি ও বাজারে নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন তাঁরা।