কুড়িগ্রাম সদর খাদ্যগুদামে সরকারি চাল ও ধানের মজুত এবং সংগ্রহে অনিয়মের মাধ্যমে ২ কোটি ১ লাখ টাকার বেশি মূল্যের খাদ্যশস্য আত্মসাতের অভিযোগে চার খাদ্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, কুড়িগ্রামের উপসহকারী পরিচালক মো. মিজানুর রহমান চৌধুরী বাদী হয়ে কুড়িগ্রাম সিনিয়র জেলা জজ আদালতে মামলাটি দায়ের করেন।
মামলার আসামিরা হলেন কুড়িগ্রাম সদর খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শরীফ আহমেদ, লালমনিরহাটের পাটগ্রাম এলএসডির সহকারী উপখাদ্য পরিদর্শক মো. হেলাল উদ্দিন, কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. হালিমুর রহমান এবং কুড়িগ্রামের ভারপ্রাপ্ত জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ হামিদুল হক।
দুদকের উপসহকারী পরিচালক মো. মিজানুর রহমান চৌধুরী মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, কুড়িগ্রাম সদর খাদ্যগুদামে অভিযান চালিয়ে বড় ধরনের অনিয়মের তথ্য পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার সুপারিশ কমিশনে পাঠানো হয়। কমিশনের অনুমতি পাওয়ার পর মামলাটি দায়ের করা হয়েছে।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে সরকারি খাদ্যশস্যের মজুত ও সংগ্রহসংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা এবং বাস্তব মজুত যাচাইয়ে বিভিন্ন অসংগতি পাওয়া যায়। এর মধ্যে নথিতে উল্লেখ থাকা চালের ঘাটতি, সংগৃহীত ধানের হিসাবের গরমিল এবং বিল পরিশোধের পরও গুদামে ধান না পাওয়ার বিষয় রয়েছে।
এজাহারে বলা হয়, গত ১১ জানুয়ারি দুদকের একটি এনফোর্সমেন্ট দল কুড়িগ্রাম সদর খাদ্যগুদামের শিশু নিকেতন ও খলিলগঞ্জ ব্লকে অভিযান চালায়। এ সময় খামাল কার্ড, গুদাম রেজিস্টার, সেন্ট্রাল লেজার ও গুদাম লেজারের তথ্যের সঙ্গে বাস্তব মজুত মিলিয়ে দেখা হয়।
যাচাইয়ে নথিভুক্ত মজুতের তুলনায় ৪২ দশমিক ২০৫ মেট্রিক টন চাল কম পাওয়া যায়। প্রতি মেট্রিক টন চালের মূল্য ৫৮ হাজার ৩১৮ টাকা ৯৮ পয়সা হিসাবে ঘাটতি চালের মূল্য দাঁড়ায় ২৪ লাখ ৬১ হাজার ৩৫২ টাকা।
দুদকের এজাহার অনুযায়ী, খলিলগঞ্জ ব্লকের টিএফএস-৭ নম্বর গুদামে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ৭১১ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে ২৪০ মেট্রিক টন ধানের বিল পরিশোধ করা হয়েছিল। কিন্তু যাচাইয়ে গুদামে ১৯০ মেট্রিক টন ধান পাওয়া গেলেও বাকি ৫০ মেট্রিক টনের সন্ধান মেলেনি।
গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দাবি করেন, ধানগুলো ছাঁটাইয়ের জন্য মেসার্স এলাহী অটো রাইস মিলে পাঠানো হয়েছিল। তবে তদন্ত কমিটি সরেজমিনে মিলটি পরিদর্শন করলে এর মালিক মো. মুকুল সরকার জানান, তাঁর মিলে কোনো ধান পাঠানো হয়নি।
এ ছাড়া একই গুদামের নথিতে থাকা আরও ৪৭১ মেট্রিক টন ধানের বাস্তব মজুত কিংবা সংগ্রহের পক্ষে সমর্থনকারী তথ্য পাওয়া যায়নি বলে দুদকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতি মেট্রিক টন ধানের মূল্য ৩৪ হাজার টাকা হিসাবে এসব ধানের মূল্য ১ কোটি ৬০ লাখ ১৪ হাজার টাকা।
দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, চাল ও ধানের মজুতসংক্রান্ত এসব অসংগতির মাধ্যমে মোট ২ কোটি ১ লাখ ৭৫ হাজার ৩৫২ টাকা মূল্যের সরকারি খাদ্যশস্য আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে।
এদিকে শিশু নিকেতন ব্লকের এসএফ-৩ নম্বর গুদামের পশ্চিম গেটসংলগ্ন স্থানে নথিবহির্ভূতভাবে ১১৯ মেট্রিক টন চালের মজুত পাওয়া যায়। এসব চালের সংগ্রহ, ওজন, মান, মজুত ও পরিবহনসংক্রান্ত বৈধ নথি দেখাতে পারেননি গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শরীফ আহমেদ বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতি মেট্রিক টন চালের মূল্য হিসাবে ওই চালের দাম ৬৯ লাখ ৩৯ হাজার ৯৫৯ টাকা। গত ১২ জানুয়ারি চালগুলো জব্দ করে জিম্মায় দেওয়া হয়।
দুদকের অভিযোগ, চার কর্মকর্তা পরস্পর যোগসাজশে সরকারি খাদ্যশস্যের মজুত ও সংগ্রহসংক্রান্ত নথিতে অসংগতি সৃষ্টি এবং তা ব্যবহার করে খাদ্যশস্য আত্মসাৎ করেছেন। এ অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০, ৪০৯ ও ১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় মামলা করা হয়েছে। পাশাপাশি নথিবহির্ভূত চাল মজুতের ঘটনায় শরীফ আহমেদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১২০(খ) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার বাদী মো. মিজানুর রহমান চৌধুরী জানান, অভিযান শেষে কমিশনে প্রতিবেদন দিয়ে মামলা করার অনুমতি চাওয়া হয়েছিল। পরে কমিশন গঠিত হওয়ার পর অনুমতি পাওয়ায় আদালতে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে।