দেশে এক মাসে হত্যাকাণ্ডের মামলা বেড়েছে ১১টি, বরিশাল রেঞ্জে মোট মামলা বেড়েছে ৪৬৬টি
দেশজুড়ে সামগ্রিক অপরাধের মামলা কমলেও সেপ্টেম্বর মাসে বেড়েছে হত্যাকাণ্ড, চুরি ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে দায়ের করা মামলার সংখ্যা। পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আগস্টে সারা দেশে ২৮৬টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হলেও সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯৭টিতে। একই সময়ে মোট অপরাধের মামলা ২৪৬টি কমে ১৮ হাজার ৬৫০টিতে নেমেছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে সারা দেশে মোট ১৮ হাজার ৮৯৬টি মামলা দায়ের হয়েছিল। সেপ্টেম্বরে তা কমে ১৮ হাজার ৬৫০টিতে দাঁড়ায়। তবে সামগ্রিক মামলার সংখ্যা কমলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অপরাধের সূচকে ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে।
পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রাম রেঞ্জে সর্বোচ্চ ৫৭টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছে, যা আগস্টে ছিল ৫০টি। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এলাকায় হত্যা মামলা ২০টি থেকে বেড়ে ৩১টিতে দাঁড়িয়েছে।
এ ছাড়া খুলনা রেঞ্জে হত্যা মামলা ২২টি থেকে বেড়ে ৩১টি, রংপুর রেঞ্জে ১৫টি থেকে বেড়ে ২১টি এবং রাজশাহী রেঞ্জে ২৩টি থেকে বেড়ে ২৭টি হয়েছে। তবে ঢাকা রেঞ্জে হত্যা মামলা ৮৬টি থেকে কমে ৫৩টিতে নেমেছে।
হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি সেপ্টেম্বরে চুরি ও দ্রুত বিচার আইনে দায়ের করা মামলাও বেড়েছে। আগস্টে সারা দেশে চুরির মামলা ছিল ৮৩৯টি, সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে ৮৬৫টিতে দাঁড়ায়। একই সময়ে দ্রুত বিচার আইনে মামলা ৫২টি থেকে বেড়ে ৮১টিতে পৌঁছেছে। এসব মামলার বৃদ্ধিতে খুলনা ও ঢাকা রেঞ্জের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে।
অন্যদিকে, সেপ্টেম্বরে ডাকাতির মামলা আগস্টের ৪২টি থেকে কমে ২৮টিতে এবং অপহরণের মামলা ৯২টি থেকে কমে ৭৮টিতে দাঁড়িয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা ২ হাজার ১৫৬টি থেকে কমে ২ হাজার ১১৩টিতে নেমেছে। লুণ্ঠনের মামলাও ১৫৪টি থেকে কমে ১৫৩টি হয়েছে।
অস্ত্র, বিস্ফোরক ও মাদক উদ্ধারসংক্রান্ত মামলার মোট সংখ্যাও সেপ্টেম্বরে কিছুটা কমেছে। আগস্টে এ ধরনের মামলা ছিল ৭ হাজার ৬১৮টি, সেপ্টেম্বরে তা কমে ৭ হাজার ৫৩৪টিতে দাঁড়ায়।
এর মধ্যে মাদক উদ্ধারসংক্রান্ত মামলা ৭ হাজার ১৬৭টি থেকে কমে ৭ হাজার ১০১টিতে নেমেছে। তবে অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরকসংক্রান্ত মামলায় ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের মামলা ১৫৯টি থেকে বেড়ে ১৬০টি হয়েছে। বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা ২৪টি থেকে বেড়ে ৩০টিতে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ করে রাজধানীতে বিস্ফোরকসংক্রান্ত মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ডিএমপি এলাকায় এ আইনে দায়ের করা মামলা আগস্টের চারটি থেকে বেড়ে সেপ্টেম্বরে ২০টিতে পৌঁছেছে।
আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের পরিসংখ্যান তুলনায় বরিশাল রেঞ্জে মোট মামলার সংখ্যায় বড় ধরনের বৃদ্ধি দেখা গেছে। আগস্টে সেখানে ১ হাজার ১১৮টি মামলা নথিভুক্ত হলেও সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে ১ হাজার ৫৮৪টিতে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, এক মাসে মামলা বেড়েছে ৪৬৬টি।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বরিশাল রেঞ্জে মাদকসংক্রান্ত মামলা ৩১০টি থেকে বেড়ে ৬৪৩টিতে এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা ২২২টি থেকে বেড়ে ২৯৬টিতে পৌঁছেছে।
সামগ্রিক মামলার সংখ্যায় বিভাগীয় রেঞ্জগুলোর মধ্যে উভয় মাসেই শীর্ষে রয়েছে ঢাকা রেঞ্জ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম রেঞ্জ। অন্যদিকে, মাদকসংক্রান্ত মামলার ক্ষেত্রে খুলনা রেঞ্জে ৬০৩টি এবং রংপুর রেঞ্জে ৫৬২টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে।
মেট্রোপলিটন এলাকাগুলোর মধ্যে ডিএমপিতে মোট মামলা আগস্টের ১ হাজার ৫০৯টি থেকে কমে সেপ্টেম্বরে ১ হাজার ৪৫৮টিতে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশে (সিএমপি) ৪৫০টি, গাজীপুর মহানগর পুলিশে (জিএমপি) ৩৪৪টি, রাজশাহী মহানগর পুলিশে (আরএমপি) ২৭৭টি, সিলেট মহানগর পুলিশে (এসএমপি) ১৬৪টি, খুলনা মহানগর পুলিশে (কেএমপি) ১৪৫টি, বরিশাল মহানগর পুলিশে (বিএমপি) ১৪২টি এবং রংপুর মহানগর পুলিশে (আরপিএমপি) ১২২টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে।
চট্টগ্রাম রেঞ্জে হত্যা মামলা বৃদ্ধির বিষয়ে রেঞ্জ ডিআইজি আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী বলেন, আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে নথিভুক্ত হত্যা মামলার সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও এর পেছনে আদালতের আদেশে পুরোনো অভিযোগের ভিত্তিতে এজাহার দায়ের এবং বিলম্বে সামনে আসা কিছু সন্দেহজনক মৃত্যুর ঘটনা রয়েছে। তাই এ বৃদ্ধিকে সরাসরি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রতিফলন হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
তার ভাষ্য, রেঞ্জের অধিকাংশ ঘটনা সামাজিক ও পারিবারিক বিরোধকেন্দ্রিক। পুরো রেঞ্জে কোনো রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেনি বলেও দাবি করেন তিনি। হত্যা ও ডাকাতির মতো কয়েকটি সূচক ছাড়া দস্যুতা, গণধর্ষণ ও অপহরণের মতো অপরাধ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা জেলায় অপরাধের প্রবণতা কমেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পুলিশের তৎপরতা তুলে ধরে ডিআইজি বলেন, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ১১টি জেলায় দিন-রাত প্রায় ১ হাজার ১০০টি মোবাইল পুলিশ দল কাজ করছে। তার দাবি, এতে অপরাধী গ্রেপ্তারের সংখ্যা আগের তুলনায় চার গুণ বেড়েছে। আগে দৈনিক গড়ে ২৫০ জন গ্রেপ্তার হলেও বর্তমানে তা এক হাজারের বেশি হয়েছে। পাশাপাশি উদ্ধারসংক্রান্ত মামলা প্রায় ৫০ শতাংশ এবং মামলা নিষ্পত্তির হার প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে বলে জানান তিনি।
নিয়মিত তদারকি ও সতর্কতামূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন এই কর্মকর্তা।
হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধির বিষয়ে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ আশরাফুল আলম বলেন, দীর্ঘমেয়াদি সংকটের কারণে অপরাধীদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে পুলিশ আগের মতো কঠোরভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। এ পরিস্থিতিতে অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশের কার্যকর ভূমিকা, মাঠপর্যায়ে সক্রিয় উপস্থিতি এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনি পদক্ষেপ জরুরি।
তার মতে, পুলিশি অভিযান ও অপরাধী গ্রেপ্তারের ইতিবাচক খবর যথাযথভাবে প্রচার না হওয়ায় অপরাধীদের মধ্যে শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ার ধারণা তৈরি হতে পারে। তাই গ্রেপ্তার ও আইনি পদক্ষেপের তথ্য প্রচারের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
২০২৪ সালের আগস্টে বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার না হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ বলেন, এসব অস্ত্র অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের ঝুঁকি রয়েছে। তাই অবৈধ অস্ত্র দ্রুত উদ্ধার এবং মাদকের উৎস ও সরবরাহব্যবস্থা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
অপরাধীদের জামিনে মুক্তি, সাক্ষীদের নিরাপত্তাহীনতা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতাকেও অপরাধ পুনরাবৃত্তির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন অধ্যাপক আশরাফুল আলম। তার মতে, সাক্ষীদের পরিচয় গোপন রাখা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে অনেকেই আদালতে সাক্ষ্য দিতে আগ্রহী হন না। এতে অপরাধীদের দণ্ড নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, বিচার বিভাগ ও সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার এবং বিচারব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।