শরীয়তপুরের গোসাইরহাটে সরু খাল দিয়ে লঞ্চ-কার্গো চলাচলের কারণে সৃষ্ট ঢেউয়ে তীরবর্তী জমি ভাঙনের অভিযোগ স্থানীয়দের। বসতভিটা ও ফসলি জমি রক্ষায় নৌযান চলাচল বন্ধের পাশাপাশি টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার কুচাইপট্টি ইউনিয়নের চর মাদারিয়া ও চর মাইঝাড়ি এলাকায় মেঘনা নদীর ভাঙন নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মেঘনার মূল প্রবাহের পরিবর্তে জনপদঘেঁষা একটি সরু খাল দিয়ে লঞ্চ, কার্গোসহ বড় নৌযান চলাচল করছে। এসব নৌযানের সৃষ্ট ঢেউয়ে খালের পাড় ভেঙে তলিয়ে যাচ্ছে ফসলি জমি। ঝুঁকিতে রয়েছে নদীতীরবর্তী বসতভিটাও।
ভাঙন থেকে নিজেদের শেষ সম্বলটুকু রক্ষায় খাল দিয়ে বড় নৌযান চলাচল বন্ধ এবং নদীতীরজুড়ে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আরও অনেক পরিবার বসতভিটা ও কৃষিজমি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হতে পারে। স্থানীয় বাসিন্দা ও উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, মেঘনাবেষ্টিত চর মাদারিয়া ও চর মাইঝাড়ি এলাকায় একসময় অন্তত ১০ হাজার মানুষের বসবাস ছিল। নদী ও চরকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল তাঁদের জীবন-জীবিকা। কৃষিকাজ ও মাছ ধরার ওপর নির্ভর করেই চলত অধিকাংশ পরিবারের সংসার। তবে দীর্ঘদিনের নদীভাঙনে বিস্তীর্ণ জনপদ, বসতভিটা ও আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভিটেমাটি হারিয়ে অনেক পরিবার চরের অন্য পাড়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
বর্তমানে যারা এসব এলাকায় বসবাস করছেন, তাঁদের জীবিকার প্রধান অবলম্বন নদী ও কৃষিজমি। কেউ মাছ ধরে সংসার চালান, আবার কেউ চরের জমিতে ধানসহ বিভিন্ন ফসল আবাদ করেন। কিন্তু নদীভাঙন ও খাল দিয়ে বড় নৌযান চলাচলের কারণে তাঁদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে খালের পাড়ঘেঁষা ফসলি জমি নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকেরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, সময় ও জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য মেঘনার মূল প্রবাহ ব্যবহার না করে বড় নৌযানগুলো চর মাদারিয়া এলাকার জনপদঘেঁষা সরু খাল দিয়ে চলাচল করছে। এসব নৌযানের সৃষ্ট ঢেউ খালের পাড়ে আঘাত করায় মাটি ধসে পড়ছে এবং তীরবর্তী জমি ভাঙনের মুখে পড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতি চললেও নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণ কিংবা ভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি তাঁদের।
সরেজমিনে দেখা যায়, সরু খাল দিয়ে লঞ্চ, কার্গোসহ বড় নৌযান চলাচল করছে। এসব নৌযানের ঢেউ আছড়ে পড়ছে খালের দুই পাড়ে। কোথাও পাড়ের মাটি ধসে পড়ছে, কোথাও ফসলি জমির কিনারা ভেঙে পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। এতে প্রতিনিয়ত জমি হারানোর আশঙ্কায় দিন কাটছে স্থানীয় কৃষকদের। স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হাসেম বলেন, ‘নদী আর খাল আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কিন্তু বড় বড় নৌযান চলাচলের সময় ঢেউ এসে পাড়ে আঘাত করে। এভাবে ভাঙতে থাকলে আমাদের বসতভিটা ও জমি রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। আমরা চাই, খাল দিয়ে বড় নৌযান চলাচল বন্ধ করে ভাঙন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’
স্বপন মৃধা বলেন, ‘আমার পূর্বপুরুষেরা এই এলাকায় বসবাস করেছেন। এখন নদীভাঙনের কারণে ঘরবাড়ি ও জমি নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। ছোট খাল দিয়ে বড় বড় নৌযান চলাচলের কারণে বসতবাড়ি ও কৃষিজমি ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়ছে। নৌযান চলাচল বন্ধের পাশাপাশি স্থায়ীভাবে খালের পাড় রক্ষার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।’ নদীভাঙন রোধ ও সরু খাল দিয়ে বড় নৌযান চলাচল বন্ধের দাবিতে স্থানীয়রা মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করেছেন। তাঁদের দাবি, দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আরও অনেক পরিবার বসতভিটা ও ফসলি জমি হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।
স্থানীয় বাসিন্দা আতাউর রহমান ওরফে দুদু মিয়া বলেন, ‘নদীভাঙনের কারণে এলাকার মানুষ সব সময় আতঙ্কে থাকেন। কখন কার ঘর বা জমি নদীতে চলে যায়, সেই দুশ্চিন্তায় দিন কাটে। আমাদের দাবি, খাল দিয়ে বড় নৌযান চলাচল বন্ধ করতে হবে এবং নদীতীর রক্ষায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করতে হবে।’ শিহাব উদ্দিন সাদ্দাম বলেন, ‘এখানকার মানুষের আয়ের বড় অংশ আসে নদী ও কৃষিজমি থেকে। ভাঙনে জমি হারালে জীবিকা চালানো কঠিন হয়ে যাবে। বড় নৌযানের ঢেউয়ের কারণে যদি ভাঙন বাড়ে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানাই।’
এ বিষয়ে গোসাইরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অমিত দত্ত বলেন, বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে দেখা হবে। বিশেষ করে নৌযান চলাচলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।